ঢাকা বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৬


https://www.ajkerbazzar.com/wp-content/uploads/2025/06/728X90_Option.gif

রোদে শুকোচ্ছে মাছ, শুঁটকিতে চাঙ্গা হাতিয়ার অর্থনীতি


স্মার্ট প্রতিনিধি
১৫:০৩ - বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৬
রোদে শুকোচ্ছে মাছ, শুঁটকিতে চাঙ্গা হাতিয়ার অর্থনীতি

নোয়াখালীর উপকূলীয় হাতিয়া উপজেলায় শুঁটকি উৎপাদন ঘিরে জমে উঠেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য ঘাট ও খোলা মাঠজুড়ে চলছে মাছ শুকানোর ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। রহমত বাজার, কাজিরবাজার, জঙ্গলিয়া, জাহাজমারা কাটাখালী ও নিঝুমদ্বীপ এলাকায় রেণু মাছ, ছোট চিংড়ি ও ছেউয়া মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত জেলে পরিবার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রহমত বাজার গোলপাতা পর্যটন কেন্দ্রের পাশে বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় সারি সারি মাছ রোদে বিছিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ মাছ বিছাচ্ছেন, কেউ উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকিয়ে যাওয়া শুঁটকি গুছিয়ে রাখছেন। এই শ্রমঘন কাজে শিশু ও কিশোর বয়সী শ্রমিকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।

জেলে পরিবারগুলোর দাবি, শুঁটকি উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে তাদের জীবিকার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পুরো মৌসুমজুড়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদকদের প্রত্যেকের অধীনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। কেউ দৈনিক মজুরিতে, আবার কেউ মাসিক বেতনে নিয়োজিত।

কিশোর শ্রমিক সৌরভ জানায়, সে নবীর মাঝির অধীনে মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে। একই হারে বেতন পায় ১০ বছরের আলিফ। আর ৬-৭ বছর বয়সী রিপন ও সাইফুল জানায়, তারা দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছে।

উৎপাদকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট চিংড়ির শুঁটকি মাছ চাষ ও পশু খাদ্যের জন্য মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাতিয়ার খাসের হাট, ওছখালী ও তমরুদ্দি বাজার ছাড়াও জেলার বাইরে বড় মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে এসব শুঁটকি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় আয়ও বেড়েছে বলে জানান তারা।

এদিকে, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ছেউয়া মাছ ধরা পড়ছে। বড় আকৃতির তাজা ছেউয়া মাছ পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও অপেক্ষাকৃত ছোট মাছগুলো শুঁটকি উৎপাদনের জন্য খোলা মাঠে শুকানো হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে শুকানো এসব শুঁটকির স্বাদ আলাদা হওয়ায় পর্যটকরাও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

তবে স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, এই লাভের আড়ালে ক্ষতির আশঙ্কাও কম নয়। নির্বিচারে রেণু ও ক্ষুদ্র চিংড়ি মাছ শুকানোর ফলে ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পাশাপাশি শিশু ও কিশোর শ্রমের ব্যবহার সামাজিক ও আইনী দিক থেকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

ব্যবসায়ী নবীর জানান, প্রতি মৌসুমে হাতিয়া থেকে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি এলেও উৎপাদন প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি অপ্রাতিষ্ঠানিক রয়ে গেছে।

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ফয়জুর রহমান বলেন, উৎপাদকদের আগ্রহ থাকলে শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এতে কেমিক্যালমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং শিশু শ্রম নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুঁটকি শিল্প হাতিয়ার জন্য টেকসই আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, তাৎক্ষণিক লাভের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির বোঝা বইতে হতে পারে দ্বীপবাসীকেই।