বৈশাখের
তীব্র তাপপ্রবাহে ক্লান্ত চারদিক। এমন সময় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসজুড়ে সবুজের স্নিগ্ধতা এনে দিয়েছেন এক
নীরব কর্মী। তিনি কোনো পরিবেশবিদ নন, নন কোনো বড় কর্মকর্তা, তিনি
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাধারণ বাবুর্চি মো. হারুন অর রশিদ।
ভাষাশহীদ
আবদুস সালাম হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বটগাছের ছায়ায় বসে আড্ডা
দিচ্ছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। মাত্র এক যুগের এই গাছটি এখন ছায়া দিচ্ছে,
প্রশান্তি দিচ্ছে। এমন আরও অসংখ্য গাছ ছড়িয়ে আছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। বট,
অর্জুন, ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া থেকে শুরু করে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, পেয়ারা,
জলপাই, তাল, জামরুল, কাঠবাদাম ও চালতাসহ প্রায় ১৫ প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ
আজ শোভা পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
আর
এই বিশাল সবুজায়নের পেছনে রয়েছেন এককভাবে কাজ করা মানুষ হারুন অর রশিদ।
বয়স ৫৪। ছোটখাটো গড়নের এই মানুষটি নিজের সীমিত আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয়
করেছেন গাছ লাগানো ও পরিচর্যায়।
২০০৬
সালে মাস্টাররোলের ভিত্তিতে বাবুর্চির চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে ২০১৪
সালে স্থায়ী হন। চাকরির পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে তিনি শুরু করেন বৃক্ষরোপণ।
প্রথমে একটি জামরুল গাছ লাগানো থেকে শুরু করে আজ তা দেড় হাজারেরও বেশি গাছে
পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে- প্রশাসনিক ভবন, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা
হল, ভাষাশহীদ আবদুস সালাম হল, মসজিদ, মন্দির, শান্তিনিকেতন, বিবি খাদিজা
হল এবং অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে তিনি রোপণ করেছেন শত শত গাছ। বিশেষ করে প্রায়
ছয় শতাধিক তালের আঁটি রোপণ করেছেন তিনি।
হারুন
অর রশিদ বলেন, চাকরি শুরুর প্রথম দিকে চিন্তা করলাম, এখানে তো সারাজীবন
থাকবো নাই, তাই কিছু একটা করি। প্রথমে কিছু তালের আটিঁ রোপন করি, একই
সঙ্গে একটি জামরুল গাছও লাগিয়েছিলাম। পরে দেখি, শিক্ষার্থী ও পাখিরা জামরুল
গাছের ফল খাচ্ছে। তখনই অনুপ্রাণিত হয়ে আরও গাছ লাগানো শুরু করি। এই
পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৫০০ বলজ-বনজ ও ওষুধি গাছ, ৫ শতাধিক তাল
গাছ লাগাই। যতদিন এখানে থাকব, গাছ লাগিয়ে যাব।
শুধু
গাছ লাগানোই নয়, নিয়মিত পরিচর্যাও করেন
হারুন অর রশিদ নিজেই। তার এই উদ্যোগে ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে পাখির
অভয়ারণ্য, শিক্ষার্থীদের জন্য শীতল ছায়া এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি
কার্যকর উদ্যোগ।
নোবিপ্রবি
ফিশারিজ এন্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সেশনের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান
হাসিব বলেন, যে মানুষ গাছ কেটে পরিবেশ ধ্বংস করছে, সেখানে আমাদের
ক্যাম্পাসের বাবুর্চি মো. হারুন অর রশিদ প্রায় এক হাজার পাঁচ শতের বেশি গাছ
লাগিয়ে নোবিপ্রবি’কে সবুজ ক্যাম্পাসে পরিনত করেছেন।
নোবিপ্রবি’র
শিক্ষার্থীরা বলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ে যত গাছ দেখা যায়, তার বড় অংশই হারুন
মামার লাগানো। একদিন তিনি থাকবেন না, কিন্তু এই গাছগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে
দেবে।
নোবিপ্রবি হিসাব
বিভাগের কর্মচারী কচি বলেন, হারুনুর রশিদ বাবুর্চির পাশাপাশি
বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ লাগিয়েছেন। আসলে তিনি একজন পরিবেশ প্রেমী। এই অবদানের
জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে সম্মাননাও দিয়েছেন। এই
ধরণের পরিবেশবাদি কর্মকান্ড অব্যাহত রাখার জন্য তাকে আর্থিকভাবেও সহযোগিতা
করা দরকার।
নোবিপ্রবি পরিবেশ বিজ্ঞান ও
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন- এই বিশ্ববিদ্যালয় যখন
প্রতিষ্ঠা হয়, তখন এটি একটি বিরান ভূমি ছিল।
আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশাসনের পাশাপাশি হারুনুর রশিদ এখানে ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছ লাগিয়েছেন।
বিশেষ করে বজ্রপাত প্রতিরোধে তিনি পাঁচ শতাধিক তাল গাছ লাগিয়েছেন। বর্তমানে
পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সবুজ অরণ্যে পরিনত হয়ে। হারুনুর রশিদের এই অবদানের
জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে।
নিঃস্বার্থ
শ্রম, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ দিয়ে বাবুর্চি হারুনুর রশিদ গড়ে তুলেছেন
সবুজে ঘেরা একটি প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস। তিনি প্রমাণ করেছেন- ইচ্ছা থাকলে যে
কেউই পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারেন।