স্থানীয় সুত্র জানায়, ২০২৪ সালের ০৫ আগস্টের
গণঅভ্যুত্থানের পর গত একবছর ধরে ওই চরের ভূমির ওপর উপজেলার হরণি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুশফিক ও
ফরিদ কমান্ডার নামের দুই ব্যক্তির ললুপ দৃষ্টি পড়ে। তাদের নেতৃত্বে
স্থানীয় ভূমি দস্যু কোপা সামছুদ্ ওরপে সামছুদ্দিন গ্রুপ চরটির বেশিরভাগ অংশ
দখল করে প্রতি একর
জমি ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ভূমিহীন ও বিভিন্ন মহলের কাছে বিক্রি করে
আসছিল। কোনো বৈধ দলিল ছাড়াই এসব জমি বিক্রি হওয়ায় ভূমিহীন পরিবারগুলো ছিল
চরম অনিশ্চয়তায়।
স্থানীয়রা
ভূমিহীনরা জানান, জমি বিক্রির অর্থ
থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিতভাবে প্রভাবশালী মহলে পৌঁছাত। কিন্তু
সম্প্রতি সেই অর্থ দেওয়া বন্ধ হলে চরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে
সুখচর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন বাহিনীর সঙ্গে জাহাজমারা ইউনিয়নের কোপা সামছু
বাহিনীর দ্বন্দ্ব চরমে ওঠে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে উভয় পক্ষই নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র
লোকজন জড়ো করে, যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত কয়েক মাস ধরে
তাদের মধ্যে বিরোধ চলছে। কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়। এরই জেরে মঙ্গলবার সকালে
সংঘাতে জড়ায় দু'পক্ষ। এসময় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। পরে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার
করে পুলিশ। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক।
নিহতদের মধ্যে, উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চর আমান উল্যাহ গ্রামের সারেং বাড়ির মহিউদ্দিনের ছেলে
আলাউদ্দিন (৪০), হাতিয়া পৌরসভার
পশ্চিম মজিদিয় গ্রামের
শাহ আলমের ছেলে
হক সাব (৫৫, জাহাজমারা ইউনিয়নের ০২ নং ওয়ার্ডের কোপা সামছু ওরপে সামছুদ্দিনের ছেলে
মোবারক হোসেন শিহাব(২২), উপজেলার
চান্দনী ইউনিয়নের নলের চর
মান্নান নগর এলাকার সেকু মিয়ার ছেলে কামাল উদ্দিন (৪০) ও সুবর্ণচর উপজেলার দক্ষিণ চর মজিদ গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে
আবুল কালাম (৬২)।
চরবাসীদের
ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দস্যু বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও
কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ভূমি দখলকে
কেন্দ্র করে অস্ত্র সংগ্রহ, ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়োগ এবং প্রভাব বিস্তারের
প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত একাধিক প্রাণহানির কারণ হয়েছে।
এলাকাবাসীর
অভিযোগ, ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের নামে খাস জমি বরাদ্দের উদ্যোগ না থাকায়
তারা বাধ্য হয়ে প্রভাবশালী মহলের কাছে টাকা দিয়ে জমি কিনতে যায়। এতে একদিকে
তারা সর্বস্বান্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ দখল ও সন্ত্রাস আরও শক্তিশালী
হচ্ছে।
ঘটনার পর হাতিয়া থানা ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড
যৌথভাবে অভিযান শুরু করলেও স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধু অভিযান নয়, চরের খাস
জমি উদ্ধার, ভূমিহীনদের স্বচ্ছ পুনর্বাসন এবং দখলবাজ চক্রের স্থায়ী উচ্ছেদ
না হলে এ ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আবারও ঘটতে পারে।
এদিকে,
চর দখলকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষের সংঘর্ষে ৫জন নিহতের
ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো রাখা হয়েছে নোয়াখালী
জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলের আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা
আজ
বুধবারও (২৪ ডিসেম্বর) দুপুর পর্যন্ত থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, যেকোনো ধরনের
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে বর্তমানে পুলিশ রয়েছে। তবে এ
ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। নিহত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ভূমিহীন
মানুষের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, নাকি
চরাঞ্চল এখনও দখলদার ও দস্যুদের অভয়ারণ্য হয়েই থাকবে? এমনটাই
প্রশ্ন তুলছে জাগলার চর’সহ হাতিয়ার মানুষ।