নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পিতার বিক্রিত জমি ক্রেতাদের নামে রেজিস্ট্রি না করে দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দেলোয়ার হোসেন রুবেলসহ চারজনের বিরুদ্ধে চরজব্বর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী একরামুল হক (৫০)। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে চরজব্বর থানায় ভুক্তভোগী একরামুল হক এই অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী একরামুল হক অভিযোগ করে বলেন, উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খাসেরহাট রাস্তার মাথা এলাকার মৃত সাইদুল হক ও তাঁর স্ত্রী ময়ুরা খাতুনের কাছ থেকে ২০১০ সালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তাঁদের নামে সরকারি বন্দোবস্তীয় ২৪ শতক জমি কেনেন তার চাচা সিরাজ মিয়া। জমি কেনার পর সেখানে দোকানপাট নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছেন তিনি। নোটারি চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, সরকারি জরিপে বিএস খতিয়ানে জমিটি বিক্রেতাদের নামে সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত হলে তাঁরা ক্রেতার নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেবেন। একইভাবে সাইদুল হকের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আলী আক্কাস, শাহাদাত হোসেন, জাহানারা বেগম ও বেলাল হোসেনসহ আরও কয়েকজন জমি কেনেন।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ১ মে সাইদুল হকের মৃত্যুর পর সরকারি জরিপে জমিটি তাঁর ও স্ত্রী ময়ুরা খাতুনের নামে বিএস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হয়। এরপর ওয়ারিশ হিসেবে তাঁদের ছেলেরা জমি ক্রেতাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা না করে উল্টো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিরাজ মিয়া ও অপরাপর ক্রেতাদের ভোগদখলীয় জমি দখলের চেষ্টা করা হয়। এরই মধ্যে কিছু জমি দখলও করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগী একরামুল হক বলেন, গত ২০ অক্টোবর সকালে দেলোয়ার হোসেন রুবেল (২৮), মো. শিপন (৪৫), মো. খোকন (৩৮) ও মো. সাদ্দাম হোসেন (৩৪) পুনরায় তাঁর চাচা সিরাজ মিয়ার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি ও স্থানীয় কয়েকজন বাধা দিলে অভিযুক্তরা তাঁদের ভয়ভীতি দেখান। একপর্যায়ে দোকানঘর ও বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করেন।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, সাইদুল হকের ছেলেরা অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় জমি দখল ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে ছবি তুলে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয়দের আরও দাবি, দেলোয়ার হোসেন রুবেলের বিরুদ্ধে এর আগেও জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত একটি মামলায় তিনি কারাগারে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী একরামুল হক বলেন, জমির প্রকৃত ক্রেতাদের নামে রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে উল্টো তাঁদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
এদিকে, অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন রুবেলের স্ত্রী মিলি আক্তার বলেন- তার স্বামীসহ পরিবারের সকল সদস্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বিরোধকৃত জমির প্রকৃত মালিক বৈধ কাগজপত্রে তার স্বামীর পরিবার। জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে তার স্বামীকে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতার করানো হয়।
চরবাটা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা বলেন, সাইদুল হক জীবিত থাকাকালে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সিরাজ মিয়াসহ কয়েকজনের কাছে ওই জমি বিক্রি করেন। পরবর্তীতে জমির ক্রেতারা সেখানে দোকানপাট নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে ভোগদখল করে আসছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সাইদুল হকের ছেলেরা একাধিকবার ওই জমি দখলের চেষ্টা করেন এবং দুটি কক্ষ দখলও করে নেন। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদে একটি মামলা হলে শুনানি শেষে ক্রেতাদের পক্ষে রায় হয়। কিন্তু বর্তমানে আবারও তারা দোকানপাটসহ ওই জমি দখলের চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে চরজব্বর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল হাসান বলেন, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তবে এ বিরোধকে কেন্দ্র করে কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সিরাজ মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দেলোয়ার হোসেন রুবেলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও দলটির বিভিন্ন মিছিল-মিটিং ও অপতৎপরতায় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে নোয়াখালী সদর উপজেলায় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁকে আটক করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণসহ সুধারাম থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে সুধারাম থানা থেকে তাঁকে চরজব্বর থানায় হস্তান্তর করা হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে জানান ওসি।