ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বামীর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননী ফাতেমা বেগমকে (২৭) তালাক দিয়েছেন তার স্বামী মো. ইদ্রিস (৪০)। এই নিয়ে তৈরী হয়েছে চাঞ্চল্য।
ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ী আংশিক)
আসনের সেনবাগ উপজেলার ২ নম্বর কেশারপাড় ইউনিয়নের ৮নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ
কেশারপাড় গ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত
১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী
কাজী মফিজুর রহমান কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার পক্ষে
সক্রিয়ভাবে কাজ করেন দক্ষিণ কেশারপাড় গ্রামের মো. রফিকের ছেলে মো. ইদ্রিস।
ভোটের দিন তিনি স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে কাপ-পিরিচ প্রতীকে ভোট দিতে কেন্দ্রে
পাঠান। কিন্তু ফাতেমা স্বামীর নির্দেশ অমান্য করে বিএনপির ধানের শীষ
প্রতীকে ভোট দেন।
ভুক্তভোগী বিবি ফাতেমা বলেন,
তার পরিবারের সবাই বিএনপির সমর্থক। তার জেঠাত ভাই সামছুল আলম ইউনিয়ন কৃষক
দলের সাধারণ সম্পাদক। সেই সুবাদে তিনি কেন্দ্রে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট
দেন। ভোট দিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে যান এবং রাতে স্বামী ইদ্রিস তার কাছে
জানতে চান কিসে ভোট দিয়েছেন? এসময় তিনি স্বামীর কাছে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার
সত্য কথা তুলে ধরলে বাড়ির সবার সামনে স্বামী ইদ্রিস তাকে মারধর করেন। পরের
দিন সকালে ইদ্রিস বাড়ি থেকে বের হয়ে ফোন বন্ধ করে দেন।
তিনি
বলেন, তিন দিন পর তার স্বামী ইদ্রিস বাড়ি ফিরলে তিনি অসুস্থ মেয়েকে
ডাক্তার দেখানোর অনুরোধ করলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবারও বাকবিতন্ডা হয়।
একপর্যায়ে ইদ্রিস স্ত্রীকে বলেন, যাকে ভোট দিয়েছিস, তার কাছ থেকে টাকা এনে
চিকিৎসা করাও। এরপরই তিনি স্ত্রীকে মৌখিকভাবে তালাক দেন বলে অভিযোগ করেন
ফাতেমা। বর্তমানে তালাকপ্রাপ্ত বিবিফাতেমা উত্তর কেশারপাড় গ্রামে তার বাবার
বাড়িতে অবস্থান করছেন।
ফাতেমা বলেন, ভোট তার
নাগরিক অধিকার। তিনি তার পছন্দের প্রার্থী এবং প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। এটা
তার স্বামীর সহ্য হয়নি। যার কারণে স্বামী ইদ্রিস তাকে বেদম মারধর করে তালাক
দিয়েছেন। তিনি বলেন, ৬ বছরের বিবি মরিয়ম, ৪ বছরের নাফিজা জাহান মিম ও ২
বছর বয়সী মো.ইসমাইল নামের তার তিনজন শিশু সন্তান রয়েছে। বাবা নেই, ছোট
ভাইয়ের অটোরিক্সা চালানোর ইনকামের টাকায় মায়ের সংসার চলে। এখন তিনি মায়ের
বাড়িতে তিন শিশু সন্তান নিয়ে কিভাবে চলবেন, কার কাছে যাবেন, এমন হতাশার চাপ
ফাতেমার চোখে-মুখে।
স্থানীয়রা বলেন, ভোট
প্রত্যেকটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। এই ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি
সংসার ভাঙতে হবে, এটা সত্যি অমানবিক। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও
সেনবাগের এমপি জয়নুল আবেদিন ফারুকের কাছে এমন অমানবিক ঘটনার বিচার দাবি
করেন স্থানীয়রা।
ঘটনার সত্যতা জানতে সরেজমিন
সেনবাগের দক্ষিণ কেশারপাড় গ্রামের আকন আলীর বাড়ি গিয়ে মো. ইদ্রিসের খোঁজখবর
নিলে তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরে তার মুঠোফোনে কল করলে ফোনের সংযোগ না
পাওয়ায় তার মন্তব্য জানা যায়নি। তবে ইদ্রিসের পিতা মো. রফিক দাবি করেন,
দীর্ঘদিন ধরেই ছেলে এবং ছেলের বৌয়ের মধ্যে পারিবারিক কলহ চলে আসছে। ভোটের
বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে তালাকের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়
০৮ নং ওয়ার্ড দক্ষিণ কেশারপাড় গ্রামের ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, তিনি
স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছেন। পরে তিনি থানা পুলিশকে ঘটনাটি
অবগত করেন।
এ বিষয়ে সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল বাশার জানান, তালাকের ঘটনা সত্য, তবে নিদিষ্ট
প্রতীকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে পারস্পরিক বক্তব্য আছে। ভুক্তভোগী নারীর পক্ষ
থেকে এখনো থানায় অভিযোগ করা হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী এমন পারিবারিক ভাঙনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।