

নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ। সেই ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় রচনার অপেক্ষায় মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবং ইউরোপের লড়াকু দল নরওয়ে। একদিকে সাম্বা ফুটবলের ঐতিহ্য, অন্যদিকে গতি আর প্রতিআক্রমণের শক্তিতে এগিয়ে চলা নরওয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে দুই দলের লক্ষ্য এক হলেও পথ ভিন্ন।
ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত ঐতিহাসিক মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ২টায় শুরু হবে শেষ ষোলোর এই মহারণ। প্রায় ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতার মেটলাইফ স্টেডিয়াম ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান ভেন্যু। এই মাঠেই ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা দলগুলোর কাছে মেটলাইফ বিশ্বকাপের শেষ গন্তব্যের প্রতীক। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, দুর্দান্ত পরিবেশ এবং বিশ্বমানের অবকাঠামোর কারণে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল ভেন্যু হিসেবে বিবেচিত এই স্টেডিয়াম ইতোমধ্যেই নকআউট পর্বের রোমাঞ্চকর লড়াইগুলোর সাক্ষী হচ্ছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে শিরোপা জিতে ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সেলেসাওরা। অন্যদিকে নরওয়ের বিশ্বকাপ ইতিহাস ছোট হলেও বড় দলগুলোর বিপক্ষে চমক দেখানোর ঐতিহ্য রয়েছে তাদের। দীর্ঘ বিরতির পর আবার নকআউটে উঠে নতুন করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছে নর্ডিক দেশটি।
চলতি বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে রয়েছে ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করলেও এরপর হাইতিকে ৩–০ এবং স্কটল্যান্ডকে একই ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে সাত পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। তিন ম্যাচে সাত গোল করেছে, হজম করেছে মাত্র একটি। শেষ বত্রিশে জাপানকে ২–১ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে ব্রাজিলের। ওই ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে গোল করেন কাসেমিরো ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি।
অন্যদিকে নরওয়ের যাত্রা ছিল উত্থান-পতনে ভরা। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে ইরাককে ৪–১ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করে তারা। দ্বিতীয় ম্যাচে সেনেগালকে ৩–২ গোলে হারিয়ে নকআউটের পথে অনেকটাই এগিয়ে যায়। শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪–১ গোলে হারলেও গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে যায় নরওয়ে। শেষ বত্রিশে আইভরি কোস্টকে ২–১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে নর্ডিকরা।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তার গতি, ড্রিবলিং ও একের বিপক্ষে এক লড়াইয়ের দক্ষতা প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। রদ্রিগো ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। শেষ বত্রিশে জাপানের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলি, আর কাসেমিরো মাঝমাঠ থেকে গোল করে দলের অভিজ্ঞতার মূল্য বুঝিয়ে দিয়েছেন। ব্রুনো গিমারায়েস ও লুকাস পাকেতা মাঝমাঠে ছন্দ ধরে রাখছেন। ডিফেন্সে মারকিনিয়োস নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আর গোলবারের নিচে অ্যালিসন বেকার বরাবরের মতোই নির্ভরতার প্রতীক।
নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্লিং হালান্ড। গোল করে নিজের ভয়ংকর রূপের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজাচ্ছেন নিখুঁতভাবে। আলেকজান্ডার সোরলথ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে দলকে এগিয়ে নিচ্ছেন। অস্কার ববের গতি, লিও ওস্টিগার্ডের দৃঢ় ডিফেন্স এবং গোলকিপার ওরইয়ান নিল্যান্ডের দুর্দান্ত সেভ নরওয়েকে এনে দিয়েছে বাড়তি আত্মবিশ্বাস।
ব্রাজিল কোচের কথা, ‘নকআউটে প্রতিটি ম্যাচই ফাইনালের মতো। নরওয়ে খুবই সংগঠিত দল। আমাদের নিজেদের সর্বোচ্চ ফুটবল খেলতে হবে।’
নরওয়ের কোচের কণ্ঠেও আত্মবিশ্বাস, ‘ব্রাজিলকে সবাই ফেবারিট বলছে। ফুটবলে নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। আমরা নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাস করি।’
অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড বলেন, ‘আমরা জানি ব্রাজিল কত বড় দল। ভয় নিয়ে মাঠে নামছি না। নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে যেকোনো কিছু সম্ভব।’
দুই দলের অতীত লড়াইও কম আকর্ষণীয় নয়। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে নরওয়ে ২–১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে। সেই স্মৃতি এখনো নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গর্বের অধ্যায়।
কৌশলগতভাবে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হবে ব্রাজিলের বলের দখলভিত্তিক আক্রমণাত্মক ফুটবলের বিপক্ষে নরওয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত প্রতিআক্রমণ। ব্রাজিল শুরু থেকেই বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচের গতি ঠিক করতে চাইবে। অন্যদিকে নরওয়ে অপেক্ষা করবে সুযোগের, তারপর হালান্ড, ওডেগার্ড ও সোরলথকে সামনে রেখে দ্রুত আঘাত হানার চেষ্টা করবে।
কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের এই লড়াইয়ে একদিকে সাম্বার ছন্দে আবারও বিশ্বজয়ের পথে এগোতে চায় ব্রাজিল, অন্যদিকে নতুন এক নর্ডিক বিস্ময় রচনা করে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিতে চায় নরওয়ে। শেষ বাঁশি বাজার পর হাসবে কি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা, নাকি বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ব্রাজিলকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস লিখবে নরওয়ে?