

২০২৪
ও ২০২৫ সালের ধারাবাহিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নোয়াখালী জেলার
মানুষের জীবনে এক অভূতপূর্ব দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্ক
ছড়িয়ে পড়ে- কখন ঘরবাড়ি ডুবে যাবে, কখন রাস্তা-ঘাট অচল হয়ে পড়বে, কখন
কৃষিজমি ও মাছের ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাবে, এই শঙ্কা নিয়েই দিন কাটে
মানুষের। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্ষার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতই যখন পুরো জেলা
অচল করে দেয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।
নোয়াখালী জেলার পানি নিষ্কাশন
ব্যবস্থা মূলত কয়েকটি প্রধান খাল ও অসংখ্য শাখা খালের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাল দখল, ভরাট ও অবহেলার কারণে কার্যত
মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। কোথাও খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলে তার প্রবাহ বন্ধ করে
দেওয়া হয়েছে, কোথাও ব্যক্তিগত মাছচাষ বা জমি দখলের উদ্দেশ্যে খালের মাঝখানে
বাঁধ দেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় খালের দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় খাল
সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নদী বা মোহনায় যেতে না পেরে
লোকালয়ে আটকে পড়ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
গেল
বছরের বন্যার পর প্রশাসন যে ভাসমান বর্জ্য অপসারণ, অস্থায়ী বাঁধ ভাঙা কিংবা
সীমিত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল, তা প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবে তা ছিল
অনেকটাই ক্ষণস্থায়ী। কারণ, খালের প্রকৃত সমস্যা- অগভীরতা ও পলি জমে যাওয়া,
এর কোন সমাধান এখনো হয়নি। বছরের পর বছর জমে থাকা পলির কারণে খালগুলোর পানি
ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ফলে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নামার পথ না
পেয়ে আশপাশের জনপদ, কৃষিজমি ও অবকাঠামো প্লাবিত করছে।
স্থানীয় পানি
ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের মতে, জেলার নোয়াখালী খাল, ভুলুয়া
খাল, বড়পিট খাল, রহমত খাল, কাটাখালী খাল, দক্ষিণ ডাকাতিয়া নদী, গাবুয়া খাল,
সোনাদিয়া খাল, হাতিয়া বোটখালী খালসহ অসংখ্য ছোট-বড় খাল আজ অস্তিত্ব সংকটে।
এসব খাল শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম নয়, কৃষি উৎপাদন, মৎস্য সম্পদ,
নৌযোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খাল নষ্ট হওয়া মানে
পুরো জীবন ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়া।
এই প্রেক্ষাপটে শুকনো
মৌসুমেই খাল সংস্কার কেন জরুরি, তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট। এ সময় পানির প্রবাহ
কম থাকায় খাল খনন, ড্রেজিং ও দখলমুক্তকরণ তুলনামূলক সহজ ও কম ব্যয়বহুল হয়।
খালের প্রকৃত গভীরতা ও প্রস্থ নির্ধারণ করা যায়, কোথায় কতটুকু দখল হয়েছে তা
সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে খালের
সংযোগ পুনর্গঠন, স্লুইসগেট ও কালভার্ট মেরামত করার জন্য এটি সবচেয়ে উপযোগী
সময়।
খাল সংস্কারে তাই আর খণ্ডিত বা লোক দেখানো উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন
সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরকারি নকশা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ খনন ও
গভীরকরণ, সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খালের মুখে থাকা বাঁধ ও প্রতিবন্ধকতা
অপসারণ, ড্রেন ও খালের সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং খালে ময়লা
ফেলা রোধে কঠোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দখলদারদের
বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ছাড়া পরিস্থিতির
পরিবর্তন সম্ভব নয়।
নোয়াখালীর মানুষ উন্নয়ন চায়, নিরাপত্তা চায়, চায়
একটি স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। কেউ আর বর্ষা এলেই ঘরবাড়ি ডুবে
যাওয়ার ভয়, ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা বা মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন নিয়ে
বাঁচতে চায় না। তাই এখন সময় এসেছে কথার চেয়ে কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।