ঢাকা বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০২৬


https://www.ajkerbazzar.com/wp-content/uploads/2025/06/728X90_Option.gif

জাতীয় নেতৃত্বের জনপদ নোয়াখালী, প্রাপ্য মর্যাদার অপেক্ষা আর কতদিন?


স্মার্ট ডেক্স
৯:২০ - বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০২৬
জাতীয় নেতৃত্বের জনপদ নোয়াখালী, প্রাপ্য মর্যাদার অপেক্ষা আর কতদিন?

মোহাম্মদ সোহেল বাদশা:
বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। উন্নয়নকে রাজধানীকেন্দ্রিক ধারা থেকে বের করে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিশ্চিত করার প্রশ্ন এখন জাতীয় নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে থাকা অথচ ইতিহাস, নেতৃত্ব ও সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ একটি জনপদ আবার সামনে এসেছে- নোয়াখালী। প্রশ্ন উঠছে, দেশের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল কি এখনও বিভাগীয় মর্যাদা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেই যাবে?

ঐতিহাসিকভাবে নোয়াখালী অঞ্চল ‘ভুলুয়া’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮২১ সালে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ- সব সময়েই এই অঞ্চল জনসংখ্যা, কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চল বিভাগীয় মর্যাদা পেলেও ভুলুয়ার সীমারেখা ও বৃহত্তর নোয়াখালী সেই তালিকায় স্থান পায়নি।

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে নোয়াখালীর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পারিবারিক শেকড় বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পারিবারিক সম্পর্কও এই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নোয়াখালীর অবদান সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার আবদুল মালেক উকিল এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই অঞ্চলেরই কৃর্তি সন্তান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের রাজনৈতিক জীবনও নোয়াখালীকে জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে নোয়াখালীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

মুক্তিযুদ্ধ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এই অঞ্চলের অবদান গৌরবোজ্জ্বল। দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন নোয়াখালীর গর্ব। ভাষা আন্দোলনের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন। চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান বাংলা সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতি- সব ক্ষেত্রেই নোয়াখালী জাতীয় ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও নোয়াখালী বিভাগ গঠনের পক্ষে শক্ত যুক্তি তুলে ধরে। প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই অঞ্চলের মানুষের কাছ থেকে। কৃষি, মৎস্য ও উপকূলীয় অর্থনীতি এখানে মানুষের প্রধান জীবিকা। বিশেষ করে হাতিয়া ও উপকূলীয় চরাঞ্চল ভবিষ্যতে নীল অর্থনীতি ও সামুদ্রিক সম্পদভিত্তিক উন্নয়নের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক কেন্দ্র দূরে থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ সমন্বয়ে প্রায়ই ধীরগতি দেখা যায়।

নোয়াখালী বিভাগ ঘোষণা করা হলে প্রশাসনিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে এবং বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নোয়াখালী বিভাগ কোনো দলীয় দাবি নয়, এটি একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় দাবি। দেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক ধারার নেতৃত্ব এই অঞ্চল থেকে উঠে এসেছে, যা প্রমাণ করে নোয়াখালী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের একটি শক্ত ভিত্তি। তাই এই অঞ্চলের প্রশাসনিক মর্যাদা বৃদ্ধি মানে শুধু একটি নতুন বিভাগ সৃষ্টি নয় বরং ইতিহাস, সম্ভাবনা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের স্বীকৃতি দেওয়া।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের নতুন ধাপে প্রবেশ করছে। এই সময়ে প্রশাসনিক কাঠামোকে যুগোপযোগী না করলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে আঞ্চলিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে হলে নোয়াখালী বিভাগ ঘোষণা একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

নোয়াখালীর মানুষের প্রত্যাশা তাই খুবই স্পষ্ট- অবহেলার দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটুক, এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব পরীক্ষায় নোয়াখালী তার প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করুক।

লেখক:
মোহাম্মদ সোহেল বাদশা
সাংবাদিক ও লেখক।