ঢাকা শুক্রবার, জুন ১৯, ২০২৬


https://www.ajkerbazzar.com/wp-content/uploads/2025/06/728X90_Option.gif

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের হয়রানি: ৪৯৬ জন নির্যাতনের শিকার


স্মার্ট প্রতিবেদক
৬:৪৪ - রবিবার, মে ৩, ২০২৬
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের হয়রানি: ৪৯৬ জন নির্যাতনের শিকার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই দেশে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।


দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬৬ জনকে হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে এবং চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সময়ে একাধিক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাদের বিভিন্ন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকলেও তারা এখনো জামিন পাননি।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু । তাদের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং তাদের জামিন আবেদন বারবার নাকচ হয়েছে।

ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার হওয়া এসব সাংবাদিক মাসের পর মাস কারাগারে অবস্থান করছেন। অনেক ক্ষেত্রে জামিন আবেদন করা হলেও তা নামঞ্জুর হচ্ছে।

গত শনিবার ভোরের কাগজ কার্যালয়ে পত্রিকাটির চট্রগ্রাম বিভাগের কাগজ প্রতিবেদক ও জেলা প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল দত্তের মুক্তি ও তার বিরুদ্ধে দেওয়া সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

ভোরের কাগজের জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে মিথ্যা পরিহার করে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশবাসী জানেন, শ্যামল দত্ত একজন অভিজ্ঞ, প্রথিতযশা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক। যিনি দীর্ঘদিন ধরে সততা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন। দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে তিনি একটি পরিচিত ও সম্মানিত নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে তার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় লেখনী পাঠকমহলে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই গণমাধ্যমের একজন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত শ্যামল দত্তকে মুক্তি দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতের পথ প্রসারিত করতে হবে।


এদিকে অনেক সাংবাদিকের অভিযোগ, ঢালাওভাবে হত্যা মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলছে। একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং একই সময়ে দুই স্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়।

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কাউকে আটক রাখা এবং জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতিও দেখা গেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। এছাড়া শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন ও মঞ্জুরুল আলম (পান্না) জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংশ্লিষ্টদের আশা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রমাণ না পাওয়া গেলে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনের শাসনের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হবে।