কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের এক মহান ঘোষণা। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় লাখো মুসলিম কুরবানি করেন, কিন্তু সব কুরবানি কি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়? বাহ্যিকভাবে বড়, দামি বা আকর্ষণীয় পশু কুরবানি দিলেই কি ইবাদত পূর্ণ হয়ে যায়?
ইসলাম আমাদের শেখায়- আল্লাহ মানুষের সম্পদ বা বাহ্যিক চাকচিক্য দেখেন না; তিনি দেখেন অন্তরের তাকওয়া, নিয়তের বিশুদ্ধতা ও আমলের সততা। তাই কুরবানির আসল সৌন্দর্য পশুর আকারে নয়, বরং হৃদয়ের খাঁটি ইখলাসে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰكِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡكُمۡ
‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩৭)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়— কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহভীতি ও আন্তরিকতা অর্জন। নিচে এমন কিছু কারণ তুলে ধরা হলো, যেগুলোর কারণে কুরবানি কবুল নাও হতে পারে। সেগুলো হলো—
১. হারাম উপার্জনের টাকায় কুরবানি
কুরবানি কবুল না হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো হারাম অর্থ দিয়ে পশু কেনা। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি বা অন্যায়ভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কুরবানি করলে বাহ্যিকভাবে তা যত বড়ই হোক, আল্লাহর কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, আর তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (মুসলিম ২৩৯৩)
অতএব, কুরবানির আগে আমাদের উপার্জনের উৎস হালাল কি না, সেটি যাচাই করা জরুরি।
২. নিয়তের বিশুদ্ধতা না থাকা
ইসলামে প্রতিটি আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত। কুরবানি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়ে লোক দেখানো, সামাজিক মর্যাদা বা অন্য কোনো স্বার্থে হয়, তাহলে সেই আমলের সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
‘নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি ১)
বিশেষ করে শরিকানা কুরবানিতে যদি একজনের নিয়তও বিশুদ্ধ না হয়, তাহলে পুরো কুরবানি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
৩. লোকদেখানো ও অহংকার
বর্তমানে অনেকেই কুরবানিকে ইবাদতের চেয়ে সামাজিক প্রদর্শনীতে পরিণত করছেন। দামি পশু কিনে ছবি তোলা, প্রচার করা বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার মানসিকতা ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।’ (সুরা আল-মায়েদা: আয়াত ২৭)
যে কুরবানিতে তাকওয়ার পরিবর্তে অহংকার থাকে, তা আল্লাহর নিকট মূল্যহীন হয়ে যায়।
৪. শরিকানায় অসমতা ও গরমিল
গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে প্রত্যেকের অংশ সমান হওয়া আবশ্যক। যদি কারও অংশ বেশি বা কম হয়, তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেই কুরবানি শুদ্ধ হবে না। একইভাবে গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার ও সঠিক ওজন নিশ্চিত করা জরুরি।
৫. শুধু মাংস পাওয়ার উদ্দেশ্য
কুরবানি শুধুই মাংস সংগ্রহের উপায় নয়। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। যদি কারও মূল উদ্দেশ্য হয় ফ্রিজ ভর্তি করা বা মাংসের আনন্দ নেওয়া, আর আল্লাহর হুকুম পালন গৌণ হয়ে যায়, তবে সেই কুরবানির আত্মা নষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
‘তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড় এবং কুরবানি কর।’ (সুরা আল-কাউসার: আয়াত ২)
৬. কুরআন-সুন্নাহর বিধান অমান্য করা
ইসলামে কুরবানির পশুর বয়স, সুস্থতা ও শারীরিক অবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي
‘চার ধরনের পশু কুরবানির জন্য বৈধ নয়— একচোখা পশু, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু, স্পষ্ট খোঁড়া পশু এবং এমন দুর্বল পশু যার হাড়ে মজ্জা নেই।’ (আবু দাউদ ২৮০২)
তাই কম বয়সী, অসুস্থ বা ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি করলে তা শুদ্ধ হবে না।
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা কী?
কুরবানি আমাদের শেখায়-
> আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে
> হালাল উপার্জনে জীবন গড়তে
> অহংকার থেকে দূরে থাকতে
> গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে
> তাকওয়া ও আন্তরিকতা অর্জন করতে
হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ত্যাগের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কিছু নেই।
কুরবানি শুধু ঈদের দিনের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইমানের পরীক্ষা এবং হৃদয়ের ইখলাসের প্রকাশ। তাই কুরবানির আগে শুধু পশু কেনার প্রস্তুতি নয়, নিজের অন্তরও প্রস্তুত করা জরুরি। হালাল উপার্জন, বিশুদ্ধ নিয়ত, তাকওয়া ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল- এসবই কুরবানিকে আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার উপযুক্ত করে তোলে। আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরবানিকে শুধু একটি পশু জবাই নয়, বরং আন্তরিক ইবাদত হিসেবে কবুল করুন এবং আমাদের অন্তরে সত্যিকারের তাকওয়া দান করুন। আমিন।